আগের নামেই ফিরে আসুক ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নাম
//মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন//
‹
রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নাম কেবল পরিচয়ের জন্য নয়; তা একটি জাতির ইতিহাস, চেতনা ও রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন। সেই বিবেচনায় ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তনের বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়—এটি একটি গভীর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রশ্ন।
একসময় এই বিমানবন্দরটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে নামকরণ করা হয়েছিল। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অনেকের কাছে তাঁর নাম মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন, জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রতীক। ফলে তাঁর নামে দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নামকরণ ছিল এক ধরনের ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।
কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই নামটি পরিবর্তন করে হযরত শাহজালাল
(রহ.)-এর নামে রাখা হয়। শাহজালাল (রহ.) নিঃসন্দেহে একজন শ্রদ্ধেয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব, যার অবদান ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক নাম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কতটা ছিল?
সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নাম পরিবর্তন অনেক সময় রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বা মতাদর্শগত পুনর্বিন্যাসের অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এতে করে একটি ধারাবাহিক জাতীয় পরিচয় গড়ে ওঠার পরিবর্তে, প্রতিবার ক্ষমতার পালাবদলে ইতিহাসের দৃশ্যমান প্রতীকগুলোও পরিবর্তিত হতে থাকে। এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে জাতির স্মৃতিকে বিভক্ত করতে পারে।
ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের প্রবেশদ্বার। এটি শুধু অবকাঠামো নয়—এটি বাংলাদেশের পরিচয়ের প্রতীক, যা বিশ্ববাসীর সামনে দেশের ইতিহাস ও চেতনাকে উপস্থাপন করে। সেই জায়গায় নামের ধারাবাহিকতা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বজায় রাখা জরুরি।
অনেকে যুক্তি দেন, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের সম্মান জানানো অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই সম্মান প্রদর্শনের জন্য নতুন স্থাপনা, প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে—যেখানে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বিঘ্নিত হবে না।
আজকের প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে; আমরা কি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রতীকগুলোকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে বদলাতে থাকব, নাকি একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক চিহ্ন বজায় রাখব?
“আগের নামেই ফিরে আসুক ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নাম”—এই দাবিটি কেবল একটি নাম পুনর্বহালের আহ্বান নয়; এটি ইতিহাসের ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং জাতীয় পরিচয়ের স্থিতিশীলতার পক্ষে একটি অবস্থান।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পরিচয় গড়ে তুলতে চায়, তবে এমন সিদ্ধান্তে জনমত, ইতিহাস এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব; সবকিছুকেই গুরুত্ব দিতে হবে।
✍🏿 লেখক
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী mahbubhossain786@yahoo.com
কমেন্ট বক্স