২৮ এপ্রিল ২০২৬ , ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬

কবি আল মুজাহিদী: স্মৃতিতে প্রজ্ঞা, মমতা ও সাহিত্যসাধনার এক আলোকবর্তিকা

আপলোড সময় : ২৮-০৪-২০২৬
কবি আল মুজাহিদী: স্মৃতিতে প্রজ্ঞা, মমতা ও সাহিত্যসাধনার এক আলোকবর্তিকা


//মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন//


নব্বই দশকে দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতায় আমার একটি কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়েই কবি আল মুজাহিদীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে। সে সময়ের একজন নবীন লেখক হিসেবে তাঁর মতো প্রতিষ্ঠিত কবি ও সাহিত্য সম্পাদকের সংস্পর্শ পাওয়া ছিল এক বিরল সৌভাগ্য। প্রথম দেখাতেই যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছিল, তা হলো তাঁর মৃদুভাষী স্বভাব, অমায়িক ব্যবহার এবং অপরিসীম ধৈর্য। তিনি কখনোই নবীনদের প্রতি ঔদ্ধত্য দেখাতেন না; বরং উৎসাহ, পরামর্শ এবং স্নেহ দিয়ে তাদের সাহিত্যচর্চায় এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করতেন।

সাহিত্যের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গভীর এবং বহুমাত্রিক। বিশেষ করে বিদেশি সাহিত্যের ওপর তাঁর দখল ছিল সত্যিই বিস্ময়কর। মার্কিন কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান -এর কবিতার অন্তর্নিহিত দর্শন, মানবতাবাদ এবং মুক্তচিন্তার ব্যাখ্যা তিনি যেভাবে তুলে ধরতেন, তা ছিল অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও চিন্তাপ্রবণ। একইসঙ্গে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর বিদ্রোহী চেতনা, সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবমুক্তির আহ্বানের সঙ্গে হুইটম্যানের কাব্যভাবনার একটি চমৎকার তুলনামূলক বিশ্লেষণ তিনি উপস্থাপন করতেন।

এই তুলনায় তিনি দেখাতেন—ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য সত্ত্বেও দুই কবির অন্তর্নিহিত মানবপ্রেম, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের উদযাপন কীভাবে এক সুতোয় গাঁথা। ওয়াল্ট হুইটম্যান-এর “লিভ্‌স অব ”-এ যে আত্মমুক্তির উচ্ছ্বাস, তা তিনি মিলিয়ে দেখাতেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম- এর ‘বিদ্রোহী’ বা অন্যান্য কবিতার অন্তর্গত শক্তির সঙ্গে। তাঁর এই বিশ্লেষণ কেবল তথ্যসমৃদ্ধই ছিল না, বরং ছিল গভীরভাবে অনুভবনির্ভর—যা একজন পাঠককে সাহিত্যকে নতুন চোখে দেখতে শেখাত।

ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় আমি অনুভব করেছি, তিনি সাহিত্যকে কেবল পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের বিষয় হিসেবে দেখতেন না। বরং এটি ছিল তাঁর কাছে এক অন্তর্গত সাধনা—এক ধরনের আত্মশুদ্ধির পথ। নতুন লেখকদের লেখা তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়তেন, ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতেন, আবার সম্ভাবনার দিকটিও তুলে ধরতেন। তাঁর উৎসাহে অনেকেই লেখালেখির জগতে স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়েছেন—এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

আজ যখন প্রবাস থেকে তাঁর অসুস্থতার খবর শুনি, তখন শুধু একজন বড় কবির কথা নয়, বরং একজন শিক্ষক, পথপ্রদর্শক এবং মানবিক গুণে ভরপুর এক মানুষকে মনে পড়ে। তাঁর মতো মানুষরা সাহিত্যের জগতে কেবল সৃষ্টির মাধ্যমে নয়, তাঁদের চিন্তা ও আচরণের মাধ্যমেও আলোক ছড়ান।

প্রার্থনা করি—এই প্রজ্ঞাবান, মমতাময় মানুষটি দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার আমাদের মাঝে ফিরে আসুন এবং তাঁর আলোয় নতুন প্রজন্ম আরও সমৃদ্ধ হোক।


লেখক: 
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com 


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ