পৌর নির্বাচনে ফ্রান্স: বড় শহরে বামদের জয়, চার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতের সাফল্য

আপলোড সময় : ২৩-০৩-২০২৬ , আপডেট সময় : ২৩-০৩-২০২৬
ফ্রান্সের ২০২৬ সালের পৌর নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার চূড়ান্ত ফলাফলে দেশটির রাজনৈতিক চিত্রে স্পষ্ট বিভাজন দেখা গেছে। বড় শহরগুলোতে বিভিন্ন বাম দলের জোটগত ও একক প্রার্থীরা তাদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখলেও, ডানপন্থি ও কট্টর ডান দলগুলিও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গত সপ্তাহে প্রথম দফা নির্বাচনের পর রোববার (২২ মার্চ) দ্বিতীয় দফার ফলাফলে মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। বড় শহরগুলোতে বামদের দাপট: প্যারিস, লিও, মার্সেই, নন্ত এবং রেন শহরে বামপন্থি প্রার্থীরা জয় ধরে রেখেছেন। প্যারিসে বাম জোটের প্রার্থী এমানুয়েল গ্রেগোয়া ৫০.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ডানপন্থি লে রিপাবলিকান (এলআর)-এর রাশিদা দাতি পেয়েছেন ৪১.৪ শতাংশ এবং এলএফই-এর সোফিয়া শিকিরু পেয়েছেন ৮.১ শতাংশ ভোট। লিও শহরে বাম জোটের গ্রেগরি দুশে ৫১.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন, যেখানে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডানপন্থি জ্যঁ-মিশেল আউলাস পেয়েছেন ৪৮.৫ শতাংশ। ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর নগরী মার্সেই শহরের বর্তমান বামপন্থি মেয়র বনুয়া পায়ো ৫৪.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে কট্টর ডান আরএন-এর ফ্রঁ আলিসিও পেয়েছেন ৪০.১ শতাংশ এবং ডানপন্থি এলআর-এর মার্তা ভাসাল পেয়েছেন ৫.২ শতাংশ। নন্র শহরে বর্তমান মেয়র জোয়ানা রোলো ৫২.৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, যেখানে ডানপন্থি প্রার্থী ফুল্ক শমবার দ্য লোয়ে পেয়েছেন ৪৭.৬ শতাংশ। রেন শহরে ফরাসি সোশ্যালিস্ট (পিএস) যদলের প্রার্থী নাথালি আপেরে ৪৩.৬ শতাংশ ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বী চার্লস কম্পানিওঁ পেয়েছেন ৩৬.৩ শতাংশ। জার্মান সীমান্তবর্তী স্ট্রসবুর্গ শহরে সোশ্যালিস্ট ও সেন্ট্রিস্ট জোটের প্রার্থী ক্যাথরিন ট্রটমান ৩৭.৫ শতাংশ ভোট নিয়ে এগিয়ে রয়েছেন, তার পেছনে আছেন বর্তমান পরিবেশবাদী মেয়র জঁ বারসেগিয়ান (৩১.৭%) এবং ডানপন্থি জঁ-ফিলিপ ভেতের (৩০.৮%)। এদিকে পোয়াতিয়ে শহরে পরিবেশবাদী দল (ইকোলোজিস্ট) তাদের পরাজয় স্বীকার করেছে। ডানপন্থিদের অগ্রগতি: ডানপন্থিরা তুলুজ ও লিমোজ শহরে তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং নতুন করে বজনসো শহর দখল করেছে। তুলুজে ডানপন্থি মেয়র জ্যঁ-লুক মুদঁক ৫৩.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, যেখানে বাম ও অতি বাম জোটের প্রার্থী ফ্রঁসোয়া পিকেমাল পেয়েছেন ৪৬.৫ শতাংশ ভোট। লিমোজ শহরে এলআর-এর গিয়োম গ্যুরাঁ ৫০.৮ শতাংশ ভোট নিয়ে এগিয়ে থেকে জয়ী হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বামপন্থি দামিয়েন মোদে পেয়েছেন ৪১.৩ শতাংশ। বজনসো শহর ১৯৫৩ সাল থেকে বামেদের দখলে ছিল৷ এবার শহরটি ডানপন্থিদের হাতে চলে গেছে। সেখানে লুদোভিক ফাগো ৫৩.১ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন, যেখানে বর্তমান মেয়র আন ভিনিও পেয়েছেন ৪৬.৯ শতাংশ। এছাড়াও ক্লেরমো-ফেরো ও ব্রেস্ট শহরেও ডানপন্থিরা জয়ের পথে বলে দাবি করেছে। কট্টর ডান আরএন-এর মিশ্র ফলাফল: আলোচিত রাজনীতিবিদ মারিন লো পেনেএ কট্টর ডান ন্যাশনাল র‍্যালী (আরএন) কিছু শহরে ব্যর্থ হলেও অন্যত্র সাফল্য পেয়েছে। দক্ষিণ ফ্রান্সের তুলোঁ শহরে আরএন প্রার্থী লর লাভালেত ৪৭.৪ শতাংশ ভোট পেয়ে পরাজিত হন, যেখানে ডানপন্থি জোসে মাসি জয়ী হন ৫২.৬ শতাংশ ভোট নিয়ে। নিম শহরে বাম ও বামঘেঁষা জোটের প্রার্থী ভাঁসাঁ বুজে ৪০.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। সেখানে আরএন-এর জুলিয়েন সানশেজ পেয়েছেন ৩৭.৯ শতাংশ এবং এলআর-এর ফ্রঁ প্রুস্ত পেয়েছেন ২১.৬ শতাংশ। তবে নিস শহরে আরএন-সমর্থিত ইউডিআর নেতা এরিক সিওত্তি ৪৭.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে ঐতিহাসিক জয় পেয়েছেন। দতার প্রতিদ্বন্দ্বী বর্তমান মেয়র ক্রিস্তিয়ান এস্ত্রোসি পেয়েছেন ৩৭.৪ শতাংশ এবং পরিবেশবাদী প্রার্থী জুলিয়েত শেনেল লো রু পেয়েছেন ১৪.৯ শতাংশ ভোট। আরএন আরও দাবি করেছে যে তারা ভিয়েরজঁ, লিয়েভাঁ, মন্তো, মন্তারজি, কাস্ত্র ও অরজসহ বেশ কয়েকটি শহরে জয় পেয়েছে। এলএফই-এর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা: অতি বাম লা ফ্রঁন্স আনসুমিজ (এলএফই) উত্তর ফ্রান্সের রুবেই শহরে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। সেখানে তাদের প্রার্থী ডেভিড গিরো ৫৩.২ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া বৃহত্তর প্যারিসের লা কুর্নভ শহরেও দলটি জয়ী হয়েছে। তবে লিলের উপকণ্ঠ ফাশ-থুমেনিল শহরে এলএফই-এর বর্তমান মেয়র প্যাট্রিক প্রোয়াজি ৪৩.১ শতাংশ ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছেন। সেখানে ডানপন্থি প্রার্থী ব্রিস লোরে ৪৮.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ভোটার উপস্থিতি: এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৫৭ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ করেছে। এটি ২০২০ সালের কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার দ্বিতীয় দফার তুলনায় অনেক বেশি হলেও ২০১৪ সালের তুলনায় কন। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনের ফলাফল দেখাচ্ছে যে ফ্রান্সের রাজনীতিতে বাম, ডান ও কট্টর ডান—তিন ধারার শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হয়েছে এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণে এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এবারের নির্বাচনে একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো; প্রায় ডজন খানেক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক বিভিন্ন শহর থেকে কাউন্সিলর ও ডেপুটি মেয়র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করছিল। এদের মধ্যে সর্বশেষ ফলাফল অনুযায়ী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ৪ কাউন্সিলর হিসবে নির্বাচিত হয়েছে। নির্বাচিত কাউন্সিলরা হলো: নাহিদুল মোহাম্মদ (৯৩-সেইন্ট ডেনিস), ফাহিম মোহাম্মদ (৯৪-ক্রেতেই), কৌশিক রাব্বানী (৯৩-সেইন্ট ডেনিস) ও জুবায়েদ আহমেদ (৯৪-ইভরি সুর সেইন) যারা নির্বাচিত হতে পারেননি, তারা হলো: নাসির উদ্দিন (৯৩- লা কুর্নভ), শরিফ আল মোমিন (৯৩-লো বুর্জে), খিয়াং নয়ন (৯১-ভিনিয়ু সুর সেইন) ও আকাশ বড়ুয়া (ভিল জানিনা) প্রথম ধাপের ফলাফলে দেখা গেছে, বেশ কিছু এলাকায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল হাড্ডাহাড্ডি। বিশেষ করে সাঁ দেনি এলাকায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর প্রার্থী নাহিদুল মোহাম্মদ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। তিনি এলএফই দলের প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়ে প্রথম ধাপেই আলোচনায় আসেন। তার এই বিজয় স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য গর্বের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশি কমিউনিটির পরিচিত মুখ ও সফল ব্যবসায়ী রাব্বানী খান প্যারিসের শহরতলি এস্তা পৌরসভা থেকে পুনরায় কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হয়েছেন। ২০২০ সালের নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক হিসেবে তাঁর প্যানেল থেকে কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ফরাসি ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে তিনি কমিউনিটিতে সুপরিচিত হয়ে উঠেছেন। আসন্ন নির্বাচনেও তিনি বর্তমান মেয়র আজেদিন তাইবির প্যানেল থেকে কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। ২৫ বছর বয়সি ফাহিম মোহাম্মদ ৮ বছর বয়সে বাবার সাথে ফ্রান্সে এসে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন। আবেদনটি ব্যর্থ হলে এক পর্যায়ে তিনি ফ্রান্সে অনিয়মিত হয়ে পড়েন। পরবর্তীতে দাবায় চ্যাম্পিয়ন হয়ে তিনি আলোচনায় আসেন, ফলে ফ্রান্সে বৈধতা পান এবং পরে ফরাসি নাগরিকত্ব লাভ করেন। ফাহিম বর্তমানে পেশায় একজন ফাইনান্সিয়াল অ্যানালিস্ট। তিনি বৃহত্তর প্যারিসের বামপন্থি প্রভাবিত ক্রেতেই (৯৪) শহর থেকে ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টি (পিএস) প্যানেল থেকে কাউন্সিলর নির্বাচনে জয় লাভ করেছেন। ৯৪ ডিপার্টমেন্টের ইভ্রি-সুর-সেন শহর থেকে জয় পেয়েছেন বাংলাদেশি তরুণ জুবায়েদ আহমেদ। তিনি পেশায় একজন ক্রিকেটার। তার প্যানেল ৫৩.১৭% ভোট পাওয়ায় ৩৯ জন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। জুবায়েদ এবারই প্রথম জনপ্রতিনিধি হলেন। ফ্রান্সে মেয়র ও পদে কাউন্সিলর পদে সরাসরি ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া হয় না,। ভোটাররা আলাদাভাবে প্রতিটি প্রার্থীর জন্য ভোট দেন না। পৌরসভা নির্বাচনের সময় নাগরিকরা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রার্থী তালিকার প্যানেলের পক্ষে ভোট দেন। এই তালিকা সাধারণত মেয়র প্রার্থীর নেতৃত্বে তৈরি করা হয় এবং এতে একাধিক প্রার্থী থাকেন, যার মধ্যে মেয়র প্রার্থীও অন্তর্ভুক্ত থাকেন। প্রতিটি তালিকা যে পরিমাণ ভোট পায়, তার অনুপাতে পৌর পরিষদের আসন বণ্টন করা হয়। ফলে তালিকায় যে প্রার্থীরা নির্দিষ্ট ক্রমে অন্তর্ভুক্ত থাকেন, তারা সেই ক্রম ও প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী নির্বাচিত হন। অর্থাৎ, কাউন্সিলররা সরাসরি ব্যক্তিগত ভোটে নয়, বরং পুরো তালিকার প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। পরে গঠিত পৌর পরিষদের সদস্যরায় নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে মেয়র হিসেবে নির্বাচন করেন।

সম্পাদকীয় :

Editor and Publisher-    Muhammad Nurul Islam

Executive Editor-  Kazi Habibur Rahman.  Managing Editor -  Eng. Mohammed Nazim Uddin
Head Office: Paris, State: Île-de-France
Dhaka office : House No-421 (1st Floor), Road No- 30, New DOHS, Mohakhali, Dhaka. Bangladesh.

Email: editor.eurobarta@gmail.com.

www.eurobarta.com সকল অধিকার সংরক্ষিত 

অফিস :