//মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন //
বাংলা সাহিত্য, ইসলামি চিন্তাধারা এবং গবেষণার জগতে আবদুল মান্নান তালিব এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৯৩৬ সালের ১৫ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের অর্জুনপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা তালেব আলী মোল্লা এবং মাতা মেহেরুন্নেসার স্নেহময় পরিবারে বেড়ে ওঠা এই মেধাবী সন্তান শৈশব থেকেই জ্ঞানার্জনের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করেন। সাত ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে পঞ্চম হলেও, চিন্তা ও মেধার দিক থেকে তিনি ছিলেন সবার থেকে স্বতন্ত্র ও অগ্রগামী।
তাঁর শিক্ষা জীবন ছিল বহুমাত্রিক ও সমৃদ্ধ। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫০ সালে ম্যাট্রিক এবং ঢাকা বোর্ড থেকে ১৯৬৬ সালে এইচএসসি পাস করার পর তিনি লাহোরের জামেয়া আশরাফিয়া থেকে দাওরা-ই-হাদিস সম্পন্ন করেন। ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার এই সমন্বয় তাঁকে একটি বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী করে তোলে। বাংলা, ইংরেজি, আরবি, উর্দু, ফারসি ও হিন্দি—এই ছয়টি ভাষায় তাঁর দক্ষতা তাঁকে জ্ঞানের এক বিশাল ভাণ্ডারে প্রবেশের সুযোগ দেয়, যার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য ও গবেষণাধর্মী গ্রন্থ অনুবাদ করে জ্ঞানকে আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দেন।
আবদুল মান্নান তালিব ছিলেন এক অসাধারণ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। আল-কুরআন, আল-হাদিস, ফিকহ্, ইতিহাস, অর্থনীতি, সাহিত্য ও সংস্কৃতি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর বিচরণ ছিল গভীর ও সুদূরপ্রসারী। যদিও তিনি নানা বিষয়ে লেখালেখি করেছেন, ইসলামই ছিল তাঁর চিন্তা-চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর সাহিত্যকর্ম মৌলিক রচনা, অনুবাদ সাহিত্য এবং শিশু-কিশোর সাহিত্য—এই তিন ধারায় বিস্তৃত। তিনশ’ এরও বেশি প্রবন্ধ এবং ১৭৬টির অধিক গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা ভাষা ও ইসলামি জ্ঞানচর্চাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁর অনেক মূল্যবান কাজ এখনও অপ্রকাশিত রয়ে গেছে, যা ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং কবি ফররুখ আহমদ এর কবিতা উর্দু ভাষায় অনুবাদ করে বাংলা সাহিত্যকে ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলেন। এর মাধ্যমে তিনি কেবল একজন অনুবাদক নন, বরং সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন রচয়িতা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয় সাংবাদিকতার মাধ্যমে, যা পরবর্তীতে গবেষণার জগতে তাঁর প্রবেশের পথ সুগম করে। ইসলামিক রিসার্চ একাডেমি, ঢাকা এবং বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারে রিসার্চ স্কলার হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করার মাধ্যমে তিনি জ্ঞানচর্চার একটি দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্য পরিষদের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ইসলামিক ‘ল’ রিসার্চ সেন্টার এন্ড লিগ্যাল এইড বাংলাদেশ-এর ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর সক্রিয় ভূমিকা তাঁকে সমাজের এক গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত আলেম ও চিন্তাবিদদের সাথে তাঁর সুসম্পর্ক ছিল। ইউসুফ আল-কারদাভী এবং খুররম মুরাদ এর মতো ব্যক্তিত্বদের সাথে মতবিনিময়ের মাধ্যমে তাঁর চিন্তাধারা আরও সমৃদ্ধ হয়। তাঁর প্রবন্ধসমূহে সময়োপযোগী ইসলামি দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়, যা সমাজের নানা সংকটে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে আবদুল মান্নান তালিব ছিলেন এক অনন্য মানবিক গুণাবলির অধিকারী। তিনি ছিলেন সত্যবাদী, সদালাপী, বিনয়ী ও অমায়িক। মানুষের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শনের মাধ্যমে তিনি সকলের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। ইসলামি আদর্শই ছিল তাঁর জীবনের মূল চালিকা শক্তি, যা তাঁর চিন্তা, কর্ম ও জীবনধারাকে পরিচালিত করেছে।
তাঁর সাথে আমার পরিচয় শৈশবকাল থেকেই, যা পরবর্তীতে আরও গভীরতায় রূপ নেয়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তাঁর মেজ ছেলে আব্দুল্লাহিল মাসুদের সাথে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে একসাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেই সূত্রেই তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং আমি তাঁকে শ্রদ্ধাভরে “তালিব চাচা” বলে সম্বোধন করতাম। একজন জ্ঞানী মানুষের সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আমার জীবনের এক মূল্যবান অর্জন হয়ে আছে, যা শুধু ব্যক্তিগত নয়, আমার চিন্তা ও আদর্শ গঠনের ক্ষেত্রেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
শৈশব থেকেই তাঁর সাথে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাঁর কাছ থেকে জ্ঞান ও প্রেরণা লাভ করি। বিশেষ করে বিশ্বকবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল , জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং কবি ফররুখ আহমদের সাহিত্যচর্চায় তাঁর উৎসাহ লেখকের জীবনকে নতুন দিকনির্দেশনা দেয়। একজন কিশোরের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করার যে মানসিকতা, তা তাঁর উদারতা ও জ্ঞানপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
তাঁর প্রভাববলয়ে গড়ে ওঠা ব্যক্তিত্বদের তালিকাও অত্যন্ত সমৃদ্ধ।কবি আল মাহমুদ, কবি আল মাহমুদ, সাবেক সচিব ও ইসলামিক স্কলার শাহ আব্দুল হান্নান, লেখক ও নাট্যকার আশকার ইবনে শাইখ, চলচ্চিত্র নির্মাতা খান আতা, কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ, কবি মতিউর রহমান মল্লিক, আবুল আসাদ, ইতিহাসবিদ আব্দুল মান্নান, গবেষক অধ্যাপক মতিউর রহমান কিংবা আবু জাফর ওবায়েদুল্লাহ-এর মতো গুণীজন তাঁর সংস্পর্শে এসে নিজেদের চিন্তা ও জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
২০১১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ঢাকার শান্তিবাগে নিজ বাসভবনে তাঁর ইন্তিকালের মাধ্যমে একটি যুগের অবসান ঘটে। তবে তাঁর কর্ম ও চিন্তা আজও জীবন্ত। ২০১৫ সালে লেখক ও সম্পাদক আবুল আসাদ
-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত “পথিকৃত” গ্রন্থ তাঁর জীবন ও কর্মকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে, যা তাঁকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আরও পরিচিত করে তুলবে।
আবদুল মান্নান তালিবের জীবন আমাদের শেখায় যে, জ্ঞান, আদর্শ এবং মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয় একজন মানুষকে কতটা উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে। তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন, বরং একটি ধারার প্রতীক—যে ধারা সত্য, জ্ঞান ও নৈতিকতার আলো ছড়িয়ে সমাজকে আলোকিত করে।
✍🏿 লেখক
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী mahbubhossain786@yahoo.com