সাগরে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনে তেল খালাস ও পরিবহন করতে আট হাজার কোটি টাকার বেশি খরচে কক্সবাজারের মহেশখালীতে নির্মিত বিশাল অবকাঠামো দীর্ঘদিন ফেলে রেখেছে বাংলাদেশ। কাজে আসছে না মজুত সক্ষমতাও।
সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং বা এসপিএম প্রকল্পে অবকাঠামোর নির্মাণকাজ ২০২৪ সালে শেষ হলেও শুধু অপারেটর নিয়োগ করে সেটি এখনো চালু করা যায়নি।
তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং বাংলাদেশে মজুত সক্ষমতা নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে এ প্রকল্পটির গুরুত্ব সামনে এসেছে।
মহেশখালীতে নির্মিত অবকাঠামোতে বাংলাদেশের বর্তমান চাহিদার প্রায় এক মাসের ক্রুড অয়েল ও এক সপ্তাহের ডিজেলের মজুত রাখার মতো ছয়টি তেলের ট্যাংক খালি পড়ে আছে।
বিদেশ থেকে আমদানি করা জ্বালানি তেল সরাসরি খালাস করতে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান বয়া, পরিবহনের জন্য ২২০ কিলামিটার পাইপলাইন ও দুই লাখ টন তেলের মজুত রাখার স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করা হয়।
এ অবকাঠামো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারলে সাগরে তেল খালাস ও পরিবহনে বছরে ৮০০ কোটি টাকার মতো সাশ্রয় হওয়ার কথা। সমস্ত অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও শুধু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঠিকাদার নিয়োগ করতে না পারায় আট হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত বিশাল অবকাঠামো প্রায় দুই বছর অলস পড়ে আছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান তেল সংকটে এই অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো। পাইপলাইনে তেল খালাস করতে পারলে বর্তমান তেল সংকটে একদিকে অর্থ এবং সময়ের অপচয় যেমন হতো না, একই সাথে তেলের মজুত সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে সংকটকালে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যেত।
তেল আমদানির পর গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সঞ্চালন ও মজুদ করার আধুনিক ব্যবস্থাপনা হিসেবে নেওয়া হয় এসপিএম বা সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং প্রকল্প।
গভীর সাগর থেকে মহেশখালীর পাম্পিং স্টেশন ও স্টোরেজ ফেসিলিটি এবং সেখান থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত ১১০ কিলোমিটার করে দুটি পৃথক পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে।
এছাড়া মহেশখালীতে প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর তেল পরিবহনের জন্য পাম্পিং স্টেশন, ডিজেল জেনারেটর এবং ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে।
ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংকের মধ্যে ক্রুড অয়েলের জন্য তিনটি ট্যাংকের প্রতিটি ৬০ হাজার কিলোলিটার বা ৪২ হাজার টন ক্ষমতার। আর ডিজেলের তিনটি ট্যাংক প্রতিটি ৩৬ হাজার কিলোলিটার প্রায় ২৫ হাজার টন।
সবমিলিয়ে ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংকে দুই লাখ টন তেলের মজুত সক্ষমতা রয়েছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় গভীর সাগরে মাদার ভেসেল বা বড় ট্যাংকার জাহাজে তেল আমদানির পর সেটি ছোট (লাইটার) ছোট জাহাজে করে কর্ণফুলী চ্যানেল দিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিবহন করা হয়।
এসপিএম ব্যবস্থায় গভীর সাগর থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরাসরি মহেশখালীতে এনে আবার পাম্প করে পাইপলাইনে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিবহন করা হবে।
প্রকল্প তত্ত্বাবধানকারী ইস্টার্ন রিফাইনারির তথ্য অনুযায়ী, সনাতন পদ্ধতিতে এক লাখ টন ক্রুড তেল আমাদানির পর খালাসে সময় লাগে ১১ দিন। আর পাইপলাইনে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সমপরিমান তেল খালাস ও পরিবহন সম্ভব।
সবমিলিয়ে সময়ের বাঁচানো ছাড়াও তেল পরিবহনে অপচয় রোধ, পরিবেশ রক্ষা এবং অর্থেরও বড় সাশ্রয় করতে পারবে এসপিএম অবকাঠামো।
কেন চালু হয়নি
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের আওতাধীন কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারির তত্ত্বাবধানে ২০২৪ সালে এসপিএম প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। সেবছর মার্চ মাসে গভীর সাগর থেকে ক্রুড ও ডিজেল খালাস করে পরিবহন টেস্টিং কমিশনিং পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
এসপিএম পরিচালনার জন্য দক্ষ অপারেটর প্রয়োজন, কারণ বাংলাদেশে এ ধরনের অভিজ্ঞ কোনো অপারেটর নেই।
জ্বালানি বিভাগ জানায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়ায় পাইপলাইনে তেল খালাস ও পরিবহন এবং মজুত অবকাঠামো চালু করা যায়নি।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি বিশেষ বিধান আইনে বিনা দরপত্রে চীনের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে। নির্মাণ শেষে এসপিএম এর অপারেশন ও মেইনটেনেন্স বা পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের ঠিকাদার নিয়োগও বিশেষ আইনে দরপত্র ছাড়াই কার্যাদেশ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিশেষ আইনটি বাতিল করলে পরে আর সেই চুক্তি হয়নি।
পরে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে অন্তর্বর্তী সরকার ঠিকাদার নিয়োগে করে যেতে না পারায় জ্বালানি তেলের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি আর চালু হয়নি।
এসপিএম প্রকল্পে নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহার করে বছরে ৯০ লাখ টন ক্রুড অয়েল এবং ডিজেল আমদানির পর খালাস ও পরিবহন করা যাবে।
কর্মকর্তারা জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা অনুযায়ী বর্তমানে এই অবকাঠামোর প্রায় ৭০ ভাগ পর্যন্ত কাজে লাগানো সম্ভব। কারণ বাংলাদেশে ক্রুড অয়েলের বাৎসরিক পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন।
বাংলাদেশে ডিজেলের চাহিদা বেশি হওয়ায় এই অবকাঠামো ব্যবহার করে ৪৫ লাখ টনের বেশি বছরে ডিজেল আমদানির পর খালাস ও পরিবহন করা যাবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান।
এ প্রকল্প পূর্ণ মাত্রায় চালু হলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হওয়া কথা। তবে যেহেতু ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ ও সম্ভাব্যতা ধরে সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তাই ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ না হলেও প্রায় বর্তমান সক্ষমতা ব্যবহার করেও প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বছরে সাশ্রয় করা সম্ভব।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোর্শেদা ফেরদৌস বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বিশেষ আইনে এটা নেওয়ার জন্য প্রসিডিং হয়ে গিয়েছিল প্রায়। বাই দিস টাইম নতুন গর্ভমেন্ট আসলো। স্পেশাল অ্যাক্ট বাতিল হলো। দ্বিতীয় দফায় টেন্ডার করা হয়েছে। এই প্রসেসগুলো করতে আসলে এই সময়টা লেগে গেছে।"
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি) এর উপাচার্য ড. ম তামিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, অগ্রাধিকার দিয়ে এসপিএম চালুর পদক্ষেপ নিলে এই বিলম্ব এড়ানো যেত।
"একটু ইনোভেটিভ চিন্তাভাবনা করলে কিন্তু আমরা এতদিনে এটা আমরা চালু করতে পারতাম।"
প্রকল্পটি চালু না হওয়ায় একদিকে সময় ও অর্থের সাশ্রয় যেটা হতো সেটা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে, আবার ঋণ পরিশোধের চাপ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, "এটা ডেফিনেটলি জ্বালানি খাতে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। প্রথমত এটা বেশ দেরি হয়েছে তৈরি করতে। কস্ট ওভাররানও হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। দুই লক্ষ টন একটা বড় মজুত সক্ষমতা যেটা ওখানে আনইউজড পড়ে আছে।"
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য ড. ম তামিম
ছবির ক্যাপশান, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য ড. ম তামিম
ম তামিম বলেন, এটি অত্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রকল্প।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "এটা চালু না হওয়ায় যেটা হয়েছে যে প্রথমত, লাইটারেজে করে আনতে খরচ বেশি হচ্ছে। মাদার ট্যাংকারগুলো কিন্তু আউটার অ্যাঙ্করেজে থাকে। আমরা ছোট ছোট জাহাজে করে আনছি। এখন যেহেতু জ্বালানির অভাবে তাই লাইটারেজেও কিন্তু অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে আমাদের। পাইপলাইনটা চালু থাকলে পাম্প করে ডিরেক্ট ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নিয়ে আসা যেত।"
"লাইটারেজে যখন তেল আনা হয় তখন একটা লস কাউন্ট হয়। পাইপলাইনে আসলে সে লসটা অনেক কমে আসবে। ফলে এটা কস্ট ইফেকটিভ সবদিক থেকে। এটা পরিবেশবান্ধব এবং আধুনিক একটা ব্যবস্থাপনা।"
দুই বছর আগে নির্মাণ শেষ হলেও এসপিএম চালু না হওয়ার পেছনে কোনো গাফিলতি বা অবহেলা আছে কি না সেটি তদন্ত করে জবাবদিহি করা দরকার বলেও মনে করেন তারা।
অধ্যাপক ম তামিম বলেন, "এটা ডেফিনেটলি খুব দ্রুততার সাথে চালু করা দরকার। যদি আমাদের ভবিষ্যতে মজুতের কথা চিন্তা করতে হয়, তাহলে ওখানে আমরা দুই লাখ টন একটা বিরাট মজুত ফেসিলিটি তৈরি করেছি। সেখানে যদি তেলের মজুত রাখতে হয়, সেটা ডিজেল হোক বা ক্রুড হোক, এটাকে আমরা স্থায়ী মজুত হিসেবেও চিন্তা করতে পারি।"
"রিফাইনারির যে মজুত আছে সেটা দেড় দুই মাস চলে। আমরা যে স্ট্র্যাটেজিক মজুতের কথা বলছে সেটা একটু ব্যয় সাপেক্ষ, এই ব্যয়টা যেহেতু হয়ে গেছে, দুই লাখ টন যদি আমরা রাখতে পারি তাহলে কিন্তু এটা আমাদের একটা স্ট্র্যাটেজিক মজুতের কাজও করতে পারে।"
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম
ছবির ক্যাপশান, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম
আরেকজন বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, সনাতন পদ্ধতিতে যে জাহাজ করে নিয়ে যাওয়া সেটা এক অর্থে সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। অন্যদিকে পাইপ লাইনের এটা মডার্ন পদ্ধতি। এটা দ্রুততর ও সাশ্রয়ী। সুতরাং সবদিক দিয়েই এটা সুবিধাজনক।
"এটা হয়ে যদি পড়ে থাকে তাহলে তো আমার মনে হয় প্রশ্ন ওঠা উচিত যে কেন বা কার গাফিলতিতে এটা পড়ে আছে। সেটা দ্রুততম সময় চালু করার জন্য যা করা দরকার সেটা করা উচিত।"
জ্বালানি বিভাগের বক্তব্য
সরকারের জ্বালানি বিভাগ বলছে, দ্রুত এ প্রকল্প চালুর ব্যাপারে সরকার আন্তরিক এবং দরপত্র মূল্যায়ন শেষে যতদ্রুত সম্ভব এটি চালু হবে।
এ প্রকল্পে তেল পাইপলাইন ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনার জন্য পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি (পিটিসিপিএলসি) গঠন করা হয়েছে। তারাই এটা দেখভাল করবে।
এসপিএম এর অপারেশনাল অ্যাকটিভিটিস যেগুলো হবে সেটার জন্য কোম্পানি জনবল নিয়োগ করেনি, এজন্য তেলের অপারেশন মেনটেনেন্সের জন্য কন্ট্রাক্টর নিয়োগ হচ্ছে। আস্তে আস্তে পিটিসিপিএলসি কোম্পানির কর্মীরা যখন শিখে যাবে এর পর এটা সম্পূর্ণভাবে তাদের কাছে ট্রান্সফার হয়ে যাবে।
এই তথ্য জানিয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোর্শেদা ফেরদৌস বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্পটি চালুর ব্যাপারে আমাদের মূল্যায়ন প্রসেসে আছে। জাস্ট প্রসেসটা শেষ হতে যে সময় লাগবে। আসলে আমি মনে করছি খুব বেশি দিন লাগবে না।"
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে বৈঠক করেছেন জানিয়ে মোর্শেদা ফেরদৌস বলেন, "আমরা ব্রিফ করেছি। কীভাবে প্রকল্প দ্রুত চালু করা যায় উনারাও বলেছেন। বিপিসি ও বিপিসি রিলেটেড লোকজনকে বলা আছে। আমরাও কনসার্ন। আমরাও চাচ্ছি দ্রুত চালু করার জন্য।"
তবে দরপত্র মূল্যায়ন শেষে অপারেটর নিয়োগ ও চালু করতে ঠিক কতদিন লাগতে পারে সেটি সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি কেউ। বিবিসি বাংলার সৌজন্যে
সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং বা এসপিএম প্রকল্পে অবকাঠামোর নির্মাণকাজ ২০২৪ সালে শেষ হলেও শুধু অপারেটর নিয়োগ করে সেটি এখনো চালু করা যায়নি।
তেলের বাজারে অস্থিরতা এবং বাংলাদেশে মজুত সক্ষমতা নিয়ে আলোচনার প্রেক্ষিতে এ প্রকল্পটির গুরুত্ব সামনে এসেছে।
মহেশখালীতে নির্মিত অবকাঠামোতে বাংলাদেশের বর্তমান চাহিদার প্রায় এক মাসের ক্রুড অয়েল ও এক সপ্তাহের ডিজেলের মজুত রাখার মতো ছয়টি তেলের ট্যাংক খালি পড়ে আছে।
বিদেশ থেকে আমদানি করা জ্বালানি তেল সরাসরি খালাস করতে বঙ্গোপসাগরে ভাসমান বয়া, পরিবহনের জন্য ২২০ কিলামিটার পাইপলাইন ও দুই লাখ টন তেলের মজুত রাখার স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করা হয়।
এ অবকাঠামো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারলে সাগরে তেল খালাস ও পরিবহনে বছরে ৮০০ কোটি টাকার মতো সাশ্রয় হওয়ার কথা। সমস্ত অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও শুধু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঠিকাদার নিয়োগ করতে না পারায় আট হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত বিশাল অবকাঠামো প্রায় দুই বছর অলস পড়ে আছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলমান তেল সংকটে এই অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো। পাইপলাইনে তেল খালাস করতে পারলে বর্তমান তেল সংকটে একদিকে অর্থ এবং সময়ের অপচয় যেমন হতো না, একই সাথে তেলের মজুত সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে সংকটকালে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যেত।
তেল আমদানির পর গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সঞ্চালন ও মজুদ করার আধুনিক ব্যবস্থাপনা হিসেবে নেওয়া হয় এসপিএম বা সিঙ্গেল পয়েন্ট ম্যুরিং প্রকল্প।
গভীর সাগর থেকে মহেশখালীর পাম্পিং স্টেশন ও স্টোরেজ ফেসিলিটি এবং সেখান থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত ১১০ কিলোমিটার করে দুটি পৃথক পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে।
এছাড়া মহেশখালীতে প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর তেল পরিবহনের জন্য পাম্পিং স্টেশন, ডিজেল জেনারেটর এবং ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংক নির্মাণ করা হয়েছে।
ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংকের মধ্যে ক্রুড অয়েলের জন্য তিনটি ট্যাংকের প্রতিটি ৬০ হাজার কিলোলিটার বা ৪২ হাজার টন ক্ষমতার। আর ডিজেলের তিনটি ট্যাংক প্রতিটি ৩৬ হাজার কিলোলিটার প্রায় ২৫ হাজার টন।
সবমিলিয়ে ছয়টি স্টোরেজ ট্যাংকে দুই লাখ টন তেলের মজুত সক্ষমতা রয়েছে।
বর্তমান ব্যবস্থায় গভীর সাগরে মাদার ভেসেল বা বড় ট্যাংকার জাহাজে তেল আমদানির পর সেটি ছোট (লাইটার) ছোট জাহাজে করে কর্ণফুলী চ্যানেল দিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিবহন করা হয়।
এসপিএম ব্যবস্থায় গভীর সাগর থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরাসরি মহেশখালীতে এনে আবার পাম্প করে পাইপলাইনে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিবহন করা হবে।
প্রকল্প তত্ত্বাবধানকারী ইস্টার্ন রিফাইনারির তথ্য অনুযায়ী, সনাতন পদ্ধতিতে এক লাখ টন ক্রুড তেল আমাদানির পর খালাসে সময় লাগে ১১ দিন। আর পাইপলাইনে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সমপরিমান তেল খালাস ও পরিবহন সম্ভব।
সবমিলিয়ে সময়ের বাঁচানো ছাড়াও তেল পরিবহনে অপচয় রোধ, পরিবেশ রক্ষা এবং অর্থেরও বড় সাশ্রয় করতে পারবে এসপিএম অবকাঠামো।
কেন চালু হয়নি
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের আওতাধীন কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারির তত্ত্বাবধানে ২০২৪ সালে এসপিএম প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। সেবছর মার্চ মাসে গভীর সাগর থেকে ক্রুড ও ডিজেল খালাস করে পরিবহন টেস্টিং কমিশনিং পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
এসপিএম পরিচালনার জন্য দক্ষ অপারেটর প্রয়োজন, কারণ বাংলাদেশে এ ধরনের অভিজ্ঞ কোনো অপারেটর নেই।
জ্বালানি বিভাগ জানায় পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ না হওয়ায় পাইপলাইনে তেল খালাস ও পরিবহন এবং মজুত অবকাঠামো চালু করা যায়নি।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ জ্বালানি বিশেষ বিধান আইনে বিনা দরপত্রে চীনের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়েছে। নির্মাণ শেষে এসপিএম এর অপারেশন ও মেইনটেনেন্স বা পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের ঠিকাদার নিয়োগও বিশেষ আইনে দরপত্র ছাড়াই কার্যাদেশ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিশেষ আইনটি বাতিল করলে পরে আর সেই চুক্তি হয়নি।
পরে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে অন্তর্বর্তী সরকার ঠিকাদার নিয়োগে করে যেতে না পারায় জ্বালানি তেলের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি আর চালু হয়নি।
এসপিএম প্রকল্পে নির্মিত অবকাঠামো ব্যবহার করে বছরে ৯০ লাখ টন ক্রুড অয়েল এবং ডিজেল আমদানির পর খালাস ও পরিবহন করা যাবে।
কর্মকর্তারা জানান, ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা অনুযায়ী বর্তমানে এই অবকাঠামোর প্রায় ৭০ ভাগ পর্যন্ত কাজে লাগানো সম্ভব। কারণ বাংলাদেশে ক্রুড অয়েলের বাৎসরিক পরিশোধন ক্ষমতা ১৫ লাখ টন।
বাংলাদেশে ডিজেলের চাহিদা বেশি হওয়ায় এই অবকাঠামো ব্যবহার করে ৪৫ লাখ টনের বেশি বছরে ডিজেল আমদানির পর খালাস ও পরিবহন করা যাবে বলে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান।
এ প্রকল্প পূর্ণ মাত্রায় চালু হলে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হওয়া কথা। তবে যেহেতু ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ ও সম্ভাব্যতা ধরে সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তাই ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ না হলেও প্রায় বর্তমান সক্ষমতা ব্যবহার করেও প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বছরে সাশ্রয় করা সম্ভব।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোর্শেদা ফেরদৌস বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বিশেষ আইনে এটা নেওয়ার জন্য প্রসিডিং হয়ে গিয়েছিল প্রায়। বাই দিস টাইম নতুন গর্ভমেন্ট আসলো। স্পেশাল অ্যাক্ট বাতিল হলো। দ্বিতীয় দফায় টেন্ডার করা হয়েছে। এই প্রসেসগুলো করতে আসলে এই সময়টা লেগে গেছে।"
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ (আইইউবি) এর উপাচার্য ড. ম তামিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, অগ্রাধিকার দিয়ে এসপিএম চালুর পদক্ষেপ নিলে এই বিলম্ব এড়ানো যেত।
"একটু ইনোভেটিভ চিন্তাভাবনা করলে কিন্তু আমরা এতদিনে এটা আমরা চালু করতে পারতাম।"
প্রকল্পটি চালু না হওয়ায় একদিকে সময় ও অর্থের সাশ্রয় যেটা হতো সেটা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে, আবার ঋণ পরিশোধের চাপ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, "এটা ডেফিনেটলি জ্বালানি খাতে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। প্রথমত এটা বেশ দেরি হয়েছে তৈরি করতে। কস্ট ওভাররানও হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। দুই লক্ষ টন একটা বড় মজুত সক্ষমতা যেটা ওখানে আনইউজড পড়ে আছে।"
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য ড. ম তামিম
ছবির ক্যাপশান, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য ড. ম তামিম
ম তামিম বলেন, এটি অত্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রকল্প।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, "এটা চালু না হওয়ায় যেটা হয়েছে যে প্রথমত, লাইটারেজে করে আনতে খরচ বেশি হচ্ছে। মাদার ট্যাংকারগুলো কিন্তু আউটার অ্যাঙ্করেজে থাকে। আমরা ছোট ছোট জাহাজে করে আনছি। এখন যেহেতু জ্বালানির অভাবে তাই লাইটারেজেও কিন্তু অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে আমাদের। পাইপলাইনটা চালু থাকলে পাম্প করে ডিরেক্ট ইস্টার্ন রিফাইনারিতে নিয়ে আসা যেত।"
"লাইটারেজে যখন তেল আনা হয় তখন একটা লস কাউন্ট হয়। পাইপলাইনে আসলে সে লসটা অনেক কমে আসবে। ফলে এটা কস্ট ইফেকটিভ সবদিক থেকে। এটা পরিবেশবান্ধব এবং আধুনিক একটা ব্যবস্থাপনা।"
দুই বছর আগে নির্মাণ শেষ হলেও এসপিএম চালু না হওয়ার পেছনে কোনো গাফিলতি বা অবহেলা আছে কি না সেটি তদন্ত করে জবাবদিহি করা দরকার বলেও মনে করেন তারা।
অধ্যাপক ম তামিম বলেন, "এটা ডেফিনেটলি খুব দ্রুততার সাথে চালু করা দরকার। যদি আমাদের ভবিষ্যতে মজুতের কথা চিন্তা করতে হয়, তাহলে ওখানে আমরা দুই লাখ টন একটা বিরাট মজুত ফেসিলিটি তৈরি করেছি। সেখানে যদি তেলের মজুত রাখতে হয়, সেটা ডিজেল হোক বা ক্রুড হোক, এটাকে আমরা স্থায়ী মজুত হিসেবেও চিন্তা করতে পারি।"
"রিফাইনারির যে মজুত আছে সেটা দেড় দুই মাস চলে। আমরা যে স্ট্র্যাটেজিক মজুতের কথা বলছে সেটা একটু ব্যয় সাপেক্ষ, এই ব্যয়টা যেহেতু হয়ে গেছে, দুই লাখ টন যদি আমরা রাখতে পারি তাহলে কিন্তু এটা আমাদের একটা স্ট্র্যাটেজিক মজুতের কাজও করতে পারে।"
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম
ছবির ক্যাপশান, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম
আরেকজন বিশেষজ্ঞ ড. বদরুল ইমাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, সনাতন পদ্ধতিতে যে জাহাজ করে নিয়ে যাওয়া সেটা এক অর্থে সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। অন্যদিকে পাইপ লাইনের এটা মডার্ন পদ্ধতি। এটা দ্রুততর ও সাশ্রয়ী। সুতরাং সবদিক দিয়েই এটা সুবিধাজনক।
"এটা হয়ে যদি পড়ে থাকে তাহলে তো আমার মনে হয় প্রশ্ন ওঠা উচিত যে কেন বা কার গাফিলতিতে এটা পড়ে আছে। সেটা দ্রুততম সময় চালু করার জন্য যা করা দরকার সেটা করা উচিত।"
জ্বালানি বিভাগের বক্তব্য
সরকারের জ্বালানি বিভাগ বলছে, দ্রুত এ প্রকল্প চালুর ব্যাপারে সরকার আন্তরিক এবং দরপত্র মূল্যায়ন শেষে যতদ্রুত সম্ভব এটি চালু হবে।
এ প্রকল্পে তেল পাইপলাইন ম্যানেজমেন্ট বা ব্যবস্থাপনার জন্য পেট্রোলিয়াম ট্রান্সমিশন কোম্পানি (পিটিসিপিএলসি) গঠন করা হয়েছে। তারাই এটা দেখভাল করবে।
এসপিএম এর অপারেশনাল অ্যাকটিভিটিস যেগুলো হবে সেটার জন্য কোম্পানি জনবল নিয়োগ করেনি, এজন্য তেলের অপারেশন মেনটেনেন্সের জন্য কন্ট্রাক্টর নিয়োগ হচ্ছে। আস্তে আস্তে পিটিসিপিএলসি কোম্পানির কর্মীরা যখন শিখে যাবে এর পর এটা সম্পূর্ণভাবে তাদের কাছে ট্রান্সফার হয়ে যাবে।
এই তথ্য জানিয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোর্শেদা ফেরদৌস বিবিসি বাংলাকে বলেন, "যত দ্রুত সম্ভব প্রকল্পটি চালুর ব্যাপারে আমাদের মূল্যায়ন প্রসেসে আছে। জাস্ট প্রসেসটা শেষ হতে যে সময় লাগবে। আসলে আমি মনে করছি খুব বেশি দিন লাগবে না।"
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এ বিষয়ে বৈঠক করেছেন জানিয়ে মোর্শেদা ফেরদৌস বলেন, "আমরা ব্রিফ করেছি। কীভাবে প্রকল্প দ্রুত চালু করা যায় উনারাও বলেছেন। বিপিসি ও বিপিসি রিলেটেড লোকজনকে বলা আছে। আমরাও কনসার্ন। আমরাও চাচ্ছি দ্রুত চালু করার জন্য।"
তবে দরপত্র মূল্যায়ন শেষে অপারেটর নিয়োগ ও চালু করতে ঠিক কতদিন লাগতে পারে সেটি সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি কেউ। বিবিসি বাংলার সৌজন্যে