//মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন//
২৭ এপ্রিল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের ৬৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে যেসব কৃতী ও দূরদর্শী নেতৃত্ব জাতির ভাগ্য পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক এক অনন্য ও উজ্জ্বল নাম। এই মহান রাষ্ট্রনায়ক, জনদরদী নেতা ও কৃষক-শ্রমিকের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে তিনি আজও বাঙালির হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত।
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের জন্ম ১৮৭৩ সালে বরিশালের চাখার গ্রামে। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও মনোযোগী। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন। তবে খুব শীঘ্রই তিনি উপলব্ধি করেন যে, সমাজের প্রকৃত পরিবর্তন শুধু আইনি পেশার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করাই জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের প্রকৃত পথ। এই উপলব্ধি থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়।
রাজনীতিতে প্রবেশ করেই তিনি জনগণের সমস্যা, বিশেষ করে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা গভীরভাবে অনুধাবন করেন। সেই সময়ের অবিভক্ত বাংলায় কৃষক সমাজ মহাজনি শোষণ, ঋণের জাল ও দারিদ্র্যের চাপে বিপর্যস্ত ছিল। শেরে বাংলা বিশ্বাস করতেন, বাংলার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর, এবং কৃষকের উন্নয়ন ছাড়া সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই তিনি কৃষকদের অধিকার রক্ষায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদন করেন। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার কেন্দ্রে ছিল কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণ।
১৯৩৭ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি প্রশাসনে জনকল্যাণমূলক পরিবর্তনের সূচনা করেন। তাঁর শাসনামলে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করা হয়, ঋণগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় এবং শিক্ষা বিস্তারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি চেষ্টা করেছিলেন প্রশাসনকে জনগণের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসতে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে রাষ্ট্রীয় সেবা লাভ করতে পারে। তাঁর নেতৃত্বে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পথ সুগম হয়।
১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের মাধ্যমে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা করেন। এই প্রস্তাব পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তায় গভীর প্রভাব ফেলে। তাঁর এই ভূমিকা তাঁকে শুধু বাংলার নয়, সমগ্র উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
শেরে বাংলা ছিলেন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের নেতা। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি উন্নত সমাজ গঠনের জন্য সকল সম্প্রদায়ের মানুষের সমান অংশগ্রহণ ও অধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। তাঁর নেতৃত্বের এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
তাঁর ব্যক্তিত্ব ছিল দৃঢ়, ন্যায়নিষ্ঠ এবং আপসহীন। তিনি কখনোই ক্ষমতার জন্য নয়, বরং জনগণের কল্যাণের জন্য রাজনীতি করেছেন। তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম, ত্যাগ এবং মানবসেবার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও তাঁর আদর্শ ও দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
এই মহান নেতার মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করি। তাঁর জীবন ও কর্ম আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের বিদেহী আত্মাকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন।
লেখক:
ফ্রান্স থেকে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
mahbubhossain786@yahoo.com